সাম্প্রতিক সময়ে ইউকে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI–সম্পর্কিত পড়াশুনার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন কোর্স চালু করছে এবং শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজার বিবেচনায় রেখে এসব বিষয়ে ভর্তি হচ্ছে। ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ১,১৬৫ জন শিক্ষার্থী AI–কেন্দ্রিক স্নাতক ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪২% বেশি। এর মানে AI এখন আর শুধু কম্পিউটার সায়েন্সের একটি ক্ষুদ্র অংশ নয়, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র ও দ্রুত বর্ধনশীল একাডেমিক ক্ষেত্র।
তবে, এটি এখনো মোট কম্পিউটিং শিক্ষার্থীদের একটি ছোট অংশ। প্রায় ৩১,৬৭০ জন প্রথম বর্ষের কম্পিউটিং শিক্ষার্থীর মধ্যে AI শিক্ষার্থীরা প্রায় ৪%। যদিও সামগ্রিকভাবে AI শিক্ষার্থীর মোট সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিসংখ্যান মতে, ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে ইউকে-তে প্রায় ১০,৮২৫ জন শিক্ষার্থী AI–সম্পর্কিত কোর্সে অধ্যয়ন করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৯% বেশি। এর মানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো AI শিক্ষার উপর বড় আকারে বিনিয়োগ করছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান আরও বিস্ময়কর। ২০১৭–১৮ থেকে ২০২২–২৩ সময়ের মধ্যে ইউকে-তে AI কোর্সে ভর্তি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪৫৩% বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে AI পড়ানো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও ২৯ থেকে বেড়ে ৮৪-এ পৌঁছেছে। এটি প্রমাণ করে যে AI শিক্ষা দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। AI কোর্সে পড়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৫৬% আন্তর্জাতিক।
AI শিক্ষায় নেতৃত্ব দিচ্ছে কিছু নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়। উদাহরণস্বরূপ, University of Hull-এ প্রায় ৭৭০ জন AI শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া University of Edinburgh তে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক AI শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ও AI শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। যেমন University of Oxford, University of Cambridge, Imperial College London এবং University College London। এসব প্রতিষ্ঠানে AI, মেশিন লার্নিং এবং ডেটা সায়েন্সে উচ্চমানের শিক্ষা দেওয়া হয়।
সাধারণত AI ডিগ্রি কোর্সগুলোতে প্রোগ্রামিং, ডেটা বিশ্লেষণ, মেশিন লার্নিং এবং AI নৈতিকতা (AI ethics) পড়ানো হয়। অনেক কোর্সে ইন্ডাস্ট্রি সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা উন্নত করার সুযোগ আছে। AI ডিগ্রির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো চাকরির বাজারে এর চাহিদা। প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং এবং ফিনটেকসহ বিভিন্ন শিল্পখাতে AI বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন দ্রুত বাড়ছে। AI-সম্পর্কিত অনেক চাকরির শুরুতেই বার্ষিক বেতন প্রায় £৪৫,০০০ থেকে £৬০,০০০ পর্যন্ত হতে পারে।
২০২৪ সালে AI গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীদের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ঘটনাও অনেক শিক্ষার্থীর কাছে AI-কে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এসব ঘটনাও বিষয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। ইউকে সরকারও AI শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে কয়েক হাজার AI বিশেষজ্ঞ তৈরি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নতুন কোর্স, গবেষণা কেন্দ্র এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই দ্রুত বৃদ্ধির বিপরীতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। AI প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম নিয়মিত আপডেট না করলে তা দ্রুত পুরোনো হয়ে যেতে পারে। এছাড়া দক্ষ শিক্ষক ও গবেষকের ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা। অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন ভবিষ্যতের AI শিক্ষাকে বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ ব্যবসা, চিকিৎসা, প্রকৌশল বা সামাজিক বিজ্ঞানের সঙ্গে AI-এর সমন্বয় করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ইউকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে প্রযুক্তি ও AI শিক্ষার একটি নতুন যুগে প্রবেশ করছে। ক্রমবর্ধমান শিল্প চাহিদা, সরকারি বিনিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের আগ্রহ এই ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করছে। ফলে ভবিষ্যতে AI এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিষয়গুলো ইউকে উচ্চশিক্ষায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়।













One response to “ব্লগ #০১ : ইউকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উচ্চশিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যা জানা উচিত”
এই ব্লগটি সত্যিই সময়োপযোগী এবং তথ্যবহুল। ইউকে-তে AI শিক্ষার দ্রুত বিকাশ শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়, বরং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও গবেষণার দিকনির্দেশও দেয়। লেখাটি সুন্দরভাবে দেখিয়েছে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন কোর্স চালু করছে এবং শিক্ষার্থীরা বাস্তব চাকরির বাজার বিবেচনায় বিষয় নির্বাচন করছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও সরকারি বিনিয়োগের বিষয়টি প্রশংসনীয়—এটি ইউকে-কে বৈশ্বিক AI শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। সব মিলিয়ে, এই বিশ্লেষণটি পাঠকদের বুঝতে সাহায্য করে যে AI এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়—এটি বর্তমানের বাস্তবতা এবং উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত।